জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ক্যালকুলেটর
বাংলাদেশে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ক্যালকুলেটর
বাংলাদেশে জমি এবং ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে খরচ কেবল একটি ফি-এর ওপর নির্ভর করে না; এটি একাধিক সরকারি দপ্তর (নিবন্ধন অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়)-এর অধীনে নির্ধারিত বিভিন্ন ফি ও করের সমষ্টি।
আমাদের এই ক্যালকুলেটরটি নিবন্ধন আইন ১৯০৮, স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯, আয়কর আইন ২০২৩ (ধারা ১২৫) ও সর্বশেষ অর্থ আইন-এর বিধিমালা অনুযায়ী ১০০% ভেরিফায়েড সূত্রে তৈরি।
মূল সরকারি ফির হার (সারসংক্ষেপ):
- সাব-রেজিস্ট্রি ফি: দলিলের মোট মূল্যের ১% (সর্বনিম্ন ১০০ টাকা)।
- স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty): দলিলের মোট মূল্যের ১.৫%।
- স্থানীয় সরকার কর: সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় ২%, ইউনিয়ন পরিষদে ১%।
- উৎসে আয়কর / গেইন ট্যাক্স (AIT): আয়কর আইনের ধারা ১২৫ অনুযায়ী এলাকাভেদে ২% থেকে ৮% (বা কাঠা ভিত্তিক সিলিং)। এটি আইনত বিক্রেতার প্রদেয়।
- মূসক / ভ্যাট (VAT): ডেভেলপার কোম্পানির নির্মিত ফ্ল্যাট হলে (১-১৬০০ বর্গফুট ২%, ১৬০১+ বর্গফুট ৪.৫%) এবং ডেভেলপার প্লটে ২%। ব্যক্তি মালিকানাধীন সেকেন্ড হ্যান্ড সম্পত্তিতে ভ্যাট নেই।
- আনুষঙ্গিক সরকারি ফি: হলফনামা স্ট্যাম্প (৳৩০০), ই-ফি (৳১০০), এন/এনএন ফি (৳১,০০০) = সর্বমোট ৳১,৪০০।
- ই-নামজারি ফি: ভূমি অফিসের নির্ধারিত সরকারি ফি ৳১,১৭০।
জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ ক্যালকুলেটর
দলিল ও সম্পত্তির বিবরণ
সাফ-কবলা দলিলগুলশান, বনানী, মতিঝিল, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, আগ্রাবাদ ইত্যাদি
* অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক ব্যয়: দলিল লেখক সমিতির ফি (Drafting Fee), স্ট্যাম্প ভেন্ডর কমিশন এবং ফটোকপি ও বাইন্ডিং বাবদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কিছু অতিরিক্ত খরচ হতে পারে যা সরকারি রশিদের বাইরে থাকে।
এই ক্যালকুলেটরের তথ্য ও লজিক **নিবন্ধন আইন ১৯০৮**, **স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯**, **আয়কর আইন ২০২৩ (ধারা ১২৫)** এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন ও এসআরও (SRO) বিশ্লেষণ করে প্রণয়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচ নির্ধারণের সরকারি নিয়ম
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধনের জন্য যেসব আইনি বিধান মেনে ফি ও কর পরিশোধ করতে হয়:
১. রেজিস্ট্রেশন ফির কাঠামো (নিবন্ধন আইন ১৯০৮)
নিবন্ধন আইন ১৯০৮ অনুযায়ী দলিলের মূল্যের ওপর ১% রেজিস্ট্রেশন ফি প্রযোজ্য (ন্যূনতম ১০০ টাকা)। এটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের অ্যাকাউন্টে ব্যাংক চালান বা নির্ধারিত পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
২. স্ট্যাম্প শুল্ক (বাংলাদেশ স্ট্যাম্প আইন ১৮৯৯)
সাফ-কবলা বা সাধারণ বিক্রয় দলিলের জন্য বর্তমান কার্যকর স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫%। এর মধ্যে দলিলের মূল প্রথম কয়েকটি পাতা ৩০০ টাকা বা ১,২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে প্রিন্ট করতে হয় এবং অবশিষ্ট স্ট্যাম্প ডিউটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত কোডে চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হয়।
৩. স্থানীয় সরকার কর (Local Government Tax)
স্থানীয় উন্নয়ন তহবিলের অংশ হিসেবে সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় এই কর আদায় করা হয়:
- সিটি কর্পোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড: দলিলের মূল্যের ২%
- পৌরসভা এলাকা: দলিলের মূল্যের ২%
- ইউনিয়ন পরিষদ (গ্রামীণ এলাকা): দলিলের মূল্যের ১%
আয়কর আইন ২০২৩ (ধারা ১২৫): উৎসে আয়কর (AIT) বা গেইন ট্যাক্স
২০২৩ সালের নতুন আয়কর আইনের ধারা ১২৫ অনুযায়ী সম্পত্তি হস্তান্তর বা নিবন্ধনের সময় সাব-রেজিস্ট্রার কর্তৃক বিক্রেতার কাছ থেকে এই কর আদায় করা বাধ্যতামূলক।
মৌজা ভিত্তিক হার ও অঞ্চল শ্রেণীবিভাগ:
- ক-শ্রেণী (ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রাইম এলাকা): গুলশান, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল, ধানমন্ডি, কারওয়ান বাজার, আগ্রাবাদ এলাকায় দলিলের মূল্যের ৮% অথবা প্রতি কাঠা/বর্গফুটে নির্ধারিত সিলিংয়ের মধ্যে যেটি বেশি।
- খ-শ্রেণী (ঢাকা ও চট্টগ্রামের অন্যান্য এলাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ): উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী এলাকায় দলিলের মূল্যের ৬% বা অঞ্চলভেদে নির্ধারিত ফিক্সড রেট।
- গ-শ্রেণী (অন্যান্য বিভাগীয় সিটি কর্পোরেশন): রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ সিটি এলাকায় ৬%।
- ঘ-শ্রেণী (জেলা সদরের পৌরসভা): ৪%।
- ঙ-শ্রেণী (গ্রামীণ ইউনিয়ন পরিষদ): ২%।
আইনি দ্রষ্টব্য (কার দায়?): ধারা ১২৫ অনুযায়ী উৎসে কর আইনত বিক্রেতার মূলধনী লাভ কর (Capital Gain Tax)। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত চুক্তি অনুযায়ী ক্রেতা ও বিক্রেতার সমঝোতায় এটি কে বহন করবেন তা নির্ধারিত হয়।
মৌজা রেট বনাম চুক্তিমূল্য: সরকারি সর্বনিম্ন ভিত্তিমূল্যের বাধ্যবাধকতা
বাংলাদেশে আপনি চাইলেই দলিলের মূল্য ইচ্ছামতো কম দেখাতে পারবেন না। প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মৌজা অনুযায়ী সরকারি সর্বনিম্ন মূল্য বা "মৌজা রেট" নির্ধারিত থাকে:
করযোগ্য ভিত্তি মূল্য = max(প্রকৃত চুক্তিমূল্য, সরকারি মৌজা রেট × জমির পরিমাণ)
যদি কোনো জমির ঘোষিত চুক্তিমূল্য সরকারি মৌজা মূল্যের চেয়ে কম হয়, তবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস আইন অনুযায়ী সরকারি মৌজা রেটকে ভিত্তি ধরেই রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক এবং এআইটি ধার্য করবে।
দলিলের প্রকৃতি অনুযায়ী সরকারি খরচের তারতম্য
সব দলিলের রেজিস্ট্রেশন খরচ এক নয়। দলিলের প্রকারভেদে সরকারি ফি-তে ব্যাপক ছাড় রয়েছে:
| দলিলের ধরন | রেজিস্ট্রেশন ফি | স্ট্যাম্প শুল্ক | স্থানীয় কর | গেইন ট্যাক্স (AIT) |
|---|---|---|---|---|
| ১. সাফ-কবলা (বিক্রি) | ১% | ১.৫% | ১% - ২% | ২% - ৮% |
| ২. হেবা (রক্তের সম্পর্কের দানপত্র) | ৳ ১০০ (ফিক্সড) | ৳ ১,০০০ (ফিক্সড) | ০% (ছাড়) | ০% (ছাড়) |
| ৩. বণ্টননামা (আপস বণ্টন) | ৳ ৫০০ (ফিক্সড) | ৳ ৫০০ (ফিক্সড) | ০% (ছাড়) | ০% (ছাড়) |
| ৪. বায়নাপত্র (Agreement) | ৳ ১,০০০ - ৳ ৫,০০০ | ৳ ১,৫০০ (ফিক্সড) | ০% (ছাড়) | ০% (মূল কবালায় প্রদেয়) |
হেবা দলিলের ক্ষেত্রে বাবা-মা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী বা সহোদর ভাই-বোনের মধ্যে হস্তান্তরে কোনো স্থানীয় সরকার কর বা উৎসে কর দিতে হয় না।
ডেভেলপার ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট (VAT) বিধিমালা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সার্কুলার অনুযায়ী রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কোম্পানি বা রিহ্যাব (REHAB) সদস্য থেকে নতুন ফ্ল্যাট ক্রয়ে ভ্যাট প্রযোজ্য:
- ১ থেকে ১৬০০ বর্গফুট ফ্ল্যাট: ২% ভ্যাট।
- ১৬০১ বর্গফুটের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাট: ৪.৫% ভ্যাট।
- ব্যক্তি মালিকানাধীন সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্ল্যাট: ব্যক্তি টু ব্যক্তি কেনাবেচায় ডেভেলপার বা কোম্পানি জড়িত না থাকলে কোনো ভ্যাট দিতে হয় না।
একটি বাস্তব উদাহরণ: ঢাকার ধানমন্ডিতে ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন
ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় ১ কোটি (১,০০,০০,০০০) টাকা মূল্যের একটি নতুন ফ্ল্যাট (১৮০০ বর্গফুট) কিনলে আনুমানিক খরচ হবে:
- রেজিস্ট্রেশন ফি (১%): ৳ ১,০০,০০০
- স্ট্যাম্প শুল্ক (১.৫%): ৳ ১,৫০,০০০
- স্থানীয় সরকার কর (২%): ৳ ২,০০,০০০
- উৎসে আয়কর / গেইন ট্যাক্স (AIT ৮%): ৳ ৮,০০,০০০ (আইনত বিক্রেতার দায়)
- ভ্যাট (১৮০০ বর্গফুট হওয়ায় ৪.৫%): ৳ ৪,৫০,০০০
- আনুষঙ্গিক সরকারি ফি ও ই-নামজারি: ~ ৳ ২,৫৭০
- ক্রেতার অংশের খরচ: ৳ ৯,০২,৫৭০
- বিক্রেতার অংশের খরচ (AIT): ৳ ৮,০০,০০০
- সর্বমোট সরকারি ব্যয়: আনুমানিক ৳ ১৭,০২,৫৭০
ই-নামজারি (E-Mutation) সরকারি ফি ও প্রক্রিয়া
জমি বা ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর মালিকানা পাকাপোক্ত করতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি করতে হয়:
- আবেদন ফি: ৳ ২০ (কোর্ট ফি) + ৳ ৫০ (নোটিশ জারি) = ৳ ৭০
- রেকর্ড সংশোধন ফি: ৳ ১,০০০
- খতিয়ান ফি: ৳ ১০০
- সর্বমোট নির্ধারিত সরকারি ফি: ৳ ১,১৭০
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: ২০২৬ সালে বাংলাদেশে জমি রেজিস্ট্রেশন ফি কত শতাংশ?
উত্তর: সাফ-কবলা দলিলের জন্য সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি ফি ১% এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ১.৫%। তবে স্থানীয় সরকার কর (১-২%) এবং উৎসে আয়কর (২-৮%) যুক্ত হয়ে এলাকাভেদে মোট খরচ সাধারণত ৭% থেকে ১৩.৫% পর্যন্ত হয়।
প্রশ্ন ২: জমি রেজিস্ট্রেশনের গেইন ট্যাক্স (AIT) কার পরিশোধ করার কথা?
উত্তর: আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১২৫ অনুযায়ী সম্পত্তি বিক্রয়ের মূলধনী লাভ কর বা উৎসে কর বিক্রেতার পক্ষ থেকে জমা দেওয়ার নিয়ম। তবে বাংলাদেশে প্রচলিত চুক্তি অনুযায়ী প্রায়শই ক্রেতা-বিক্রেতা আলোচনার মাধ্যমে এটি নির্ধারণ করেন।
প্রশ্ন ৩: ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে কি ভ্যাট (VAT) বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, যদি ফ্ল্যাটটি কোনো রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কোম্পানি থেকে কেনা হয়। ১৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত ২% এবং ১৬০১ বর্গফুটের বেশি হলে ৪.৫% ভ্যাট প্রযোজ্য। তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্ল্যাটে ভ্যাট প্রযোজ্য নয়।
প্রশ্ন ৪: হেবা দলিলে রেজিস্ট্রেশন খরচ কত?
উত্তর: পিতা-মাতা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী বা সহোদর ভাই-বোনের মতো রক্তের সম্পর্কের মধ্যে হেবা দলিলে কোনো গেইন ট্যাক্স বা স্থানীয় কর নেই। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি মাত্র ১০০ টাকা এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ১,০০০ টাকা ফিক্সড।
প্রশ্ন ৫: ই-নামজারি (Mutation) সরকারি ফি কত?
উত্তর: ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন পোর্টালে ই-নামজারি সরকারি ফি সর্বমোট ১,১৭০ টাকা (আবেদন ফি ৭০ টাকা + নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা + রেকর্ড সংশোধন ফি ১,০০০ টাকা + খতিয়ান ফি ১০০ টাকা)।